চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় এ ধরনের চিকিৎসকদের খুঁজে বের করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। পাশাপাশি পুলিশ-র্যাবও অভিযান চালাচ্ছে। গত দুই মাসে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১৫ জন ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
- ছবিতে সাইনবোর্ডধারীদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই।
- ছবিতে সাইনবোর্ডধারীদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই।
- ছবিতে সাইনবোর্ডধারীদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই
অনুসন্ধান: স্থানীয় সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে এই প্রতিবেদকও নগরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫ জন ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান পেয়েছেন। এঁরা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার (রোগনির্ণয় কেন্দ্র), ব্যক্তিগত চেম্বার বা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখেন। তাঁরা সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে যেসব ডিগ্রি ব্যবহার করছেন, তা-ও ভুয়া। অন্তত ছয়জন কথিত চিকিৎসক এই প্রতিবেদকের কাছে তাঁদের ডিগ্রি-সংক্রান্ত তথ্য সঠিক নয় বলে স্বীকার করেছেন। এঁদের কারও কারও পল্লিচিকিৎসকের প্রশিক্ষণ থাকলেও তাঁরা নিজেদের এমবিবিএস ডিগ্রিধারী বলে দাবি করে আসছিলেন। অনেকে একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিও ব্যবহার করছেন। অবশ্য এঁদের মধ্যে কেউ কেউ অলটারনেটিভ মেডিসিন (এএম) বা বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র।
কোথায় কে: নগরের বহদ্দারহাট মোড়ে মডার্ন ডায়াগনস্টিক নামের একটি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে এস এম তৌহিদুল করিম নামের এক ব্যক্তি রোগী দেখেন। সাইনবোর্ডে তাঁর নামের পাশে লেখা ‘এমবিবিএস, এমডি মেডিসিন। পিজিটি (মা ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ)’।
অভিযোগ উঠেছে, এর কোনো ডিগ্রিই তাঁর নেই এবং তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধিত চিকিৎসকও নন।
- ছবিতে সাইনবোর্ডধারীদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই।
- ছবিতে সাইনবোর্ডধারীদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই।
তৌহিদুল করিম বহদ্দারহাটের মডার্ন ডায়াগনস্টিকের পাশাপাশি আনোয়ারা উপজেলা সদরের আনোয়ারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পালা করে রোগী দেখেন।
মডার্ন ডায়াগনস্টিকের স্বত্বাধিকারী অসীম মহাজন বলেন, ‘সম্প্রতি ডাক্তারদের ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর তিনি (তৌহিদুল) অনিয়মিতভাবে এখানে আসছেন। আমি তাঁকে ডাক্তারি সনদ জমা দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি দেননি।’ সনদ না দেখে একজনকে কীভাবে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে দিচ্ছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা জানি, তিনি বেসরকারি একটি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছেন। তবে তা স্বীকৃত নয়।’
তৌহিদুল করিম আনোয়ারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এখনো প্রতি শুক্র, সোম ও বুধবার রোগী দেখছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম ওরফে সরোজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ওখানে ১০ জনের মতো চিকিৎসক বসেন। কারও সনদ আমাদের কাছে নেই। তবে জমা দিতে বলেছি। তৌহিদুল করিম স্বীকৃত চিকিৎসক কি না, তা আমার জানা নেই।’
ফার্মেসিতে ভুয়া চিকিৎসক: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শান্তিবাগের শ্যামলী আবাসিক এলাকার জিৎ ফার্মেসি ও ডবলমুরিং থানার পাশে জি এইচ এম্পোরিয়াম নামের দুটি ওষুধের দোকানে চেম্বার খুলে নিয়মিত রোগী দেখেন লোকমান খান। সাইনবোর্ডে তাঁর নামের পাশে লেখা ‘এমবিবিএস, পিজিটি (মেডিসিন হূদেরাগ), সিসিডি ডায়াবেটলজি (বারডেম, ঢাকা), এমডি (পার্ট টু গ্যাস্ট্রোলিভার)’।
ছবির সাইনবোর্ডধারীর নেই ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি। কিন্তু তাঁদের নামের পাশে বিভিন্ন ডিগ্রির নাম উল্লেখ করে ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কথা বলে নজরকাড়া হচ্ছে রোগীদের
জিৎ ফার্মেসির মালিক অঞ্জন ও জি এইচ এম্পোরিয়ামের মালিক মো. কাশেম বলেছেন, লোকমান খান যে ভুয়া চিকিৎসক, সেটা তাঁরা আগে থেকে জানতেন না।
পাঁচ বছর ধরে নগরের মোগলটুলী বাজারের ইডেন ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখছেন অরুণ কুমার রায়। সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে তাঁর নামের পাশে ‘এমবিবিএস, পিজিটি (মেডিসিন ও শিশু), সিএমএসসি, এফডব্লিউটি (দিল্লি), সার্জারি রোগবিশেষজ্ঞ’ ইত্যাদি উল্লেখ করা।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অরুণ বছর দুয়েক আগেও ঘড়ি মেরামতের কাজ করতেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘড়ির দোকানটি তাঁর পারিবারিক ছিল। তিনি বিএ পাস করার পর দূরশিক্ষণের মাধ্যমে ঢাকার পিচ ব্লেন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস করেন। কলা বিভাগে পড়াশোনা করার পরও কীভাবে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করলেন—এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে যান অরুণ। বলেন, ‘কিছু একটা করে খাই, ভাই। রোগীদের সামর্থ্য অনুযায়ী ৫০-১০০ টাকা ফি নিই। যেসব কেস পারি না, সেগুলো বড় চিকিৎসকদের কাছে পাঠাই।’
মো. ফরিদুল আলম আগে একটি বিমা কোম্পানির প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি এখন নামের পাশে এমবিবিএস (বিএমসিসিএমএইচ) লিখে চান্দগাঁও নুরুজ্জামান নাজির সড়কের খাজা ফার্মেসিতে রোগী দেখছেন।
ফরিদুল আলম বলেন, ‘আমি কলকাতার ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিবিএস (অলটারনেটিভ মেডিসিন—এএম) করেছি। এটা অনেকটা দূরশিক্ষণে করা। কিন্তু দেশে এই ডিগ্রির স্বীকৃতি নেই।’ এমবিবিএস (এএস) কোর্সও করেছেন দাবি করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পিচ ব্লেন্ড ইউনিভার্সিটিও এই ডিগ্রি দিয়ে থাকে। এসএসসি পাস করেও এই ডিগ্রি নেওয়া যায়।
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার জাহেদুল হক বসুনিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দূরশিক্ষণে এমবিবিএস করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ডিগ্রি দেওয়ার অনুমোদন দেয়নি বিএমডিসি। তিনি বলেন, পিচ ব্লেন্ড ইউনিভার্সিটির প্রতারণার বিষয়টি জানার পর বিএমডিসি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করে। ওয়ারেন্টও জারি হয়। তবে পুলিশ উত্তরার এই প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পায়নি দাবি করে কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, এরা নাম পরিবর্তন করে ফেলেছে।
আরও যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: সিভিল সার্জনের দপ্তরে আসা অভিযোগ থেকে জানা যায়, চিকিৎসক সেজে মোহাম্মাদ হারুন ও সমীরণ দত্ত মিস্ত্রিপাড়ায়, মো. আলী মুহুরিপাড়ায়, জাকির হোসেন বেপারীপাড়ায়, নারায়ণ চন্দ্র বড়পোল মোড়ে, এন ইসলাম আতুরার ডিপো এলাকায় রোগী দেখছেন। বন্দরটিলা ও কলসিদিঘির পাড় এলাকায় আফতাবুল ইসলাম, আখতার হোসেন, এম জি ভূঁইয়া ও মো. ইব্রাহিম এমবিবিএস (এএম) এবং মোমিনুল ইসলাম, মানিক শর্মা ও এইচ কবির নামের শেষে এমবিবিএস লিখে রোগী দেখেন।
সংগঠন: অলটারনেটিভ মেডিসিনে ‘এমবিবিএস ডিগ্রিধারী’ চিকিৎসকদের ন্যাশনাল মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এনএমএ) নামে একটি সংগঠন আছে। চিকিৎসক হিসেবে সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য না হওয়ায় তাঁরা বিএমডিসির বিকল্প হিসেবে গঠন করেছে বাংলাদেশ কম্বাইন্ড মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিসিএমডিসি) নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। এটাকে তাঁরা নিবন্ধিত সংস্থা হিসেবে দাবি করেছেন।
এনএমএর সভাপতি এইচ কবির (হুমায়ুন কবির) দাবি করে বলেন, ‘আমরা অলটারনেটিভ মেডিসিন কিংবা কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনের ওপর “এমবিবিএস” ডিগ্রিধারী। এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো স্বীকৃতি পায়নি। তবে আমাদের অনেকে এমবিবিএস লিখে নিচে কমপ্লিমেন্টারি কিংবা অলটারনেটিভ মেডিসিন শব্দগুলো লেখেন না, যার কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হয়।’ তিনি বলেন, ‘যারা এটা লেখে না, তাদেরকে প্রশাসন ধরুক।’
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার জাহেদুল হক বসুনিয়া বলেন, বিসিএমডিসি ভুয়া সংগঠন। কাউকে চিকিৎসকের নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষমতা বা অধিকার তাঁদের নেই।
সিভিল সার্জন আবু তৈয়ব বলেন, সমিতির মতো নিবন্ধন নিয়ে তারা এটাকে নিবন্ধিত সংস্থা দাবি করছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মোরশেদ হোসেন (আনোয়ারা প্রতিনিধি)]
সুত্র: প্রথম আলো.কম, ২০/১২/২০১১
No comments:
Post a Comment